হানিমুনে বিভীষিকা
কলমেঃ প্রসেনজিৎ রায়

হানিমুন! এই শব্দটা শুনলেই কেমন একটা রোমান্টিক অনুভূতি হয়, তাই না?আমরাও ঠিক সেরকমই আনন্দ আর উত্তেজনা নিয়ে পৌঁছে গেলাম লেপচা, দার্জিলিং-এর এক ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামে। পৌঁছানোর পর থেকেই কেমন একটা অস্বস্তি কাজ করছিল।
প্রথম দিন রাতেই রহস্যের ছায়া নেমে এলো আমাদের হানিমুনে। হঠাৎ করেই এক অতিথির মৃত্যু ঘটে—প্রথম দর্শনে মনে হলো হার্ট অ্যাটাক। কিন্তু কেন জানি না, আমার মনে হলো ব্যাপারটা এত সহজ নয়।
আর সত্যিই, যত সময় এগোতে লাগল, ততই যেন সবকিছু আরও ঘোরালো হয়ে উঠল। প্রত্যেকের আচরণ সন্দেহজনক লাগছিল। কেউ একজন সত্য লুকোচ্ছে!
আমার ভিতরের গোয়েন্দা সত্তা জেগে উঠল। মিস্টির চোখেও দেখলাম সেই একই কৌতূহল। আমরা কি পারব সত্য উদঘাটন করতে? নাকি এই হানিমুন আমাদের জন্যই আরও বিপজ্জনক কিছু বয়ে আনবে?
একটা খুন, কিছু রহস্যময় চরিত্র, আর পাহাড়ের কোলে লুকিয়ে থাকা এক অজানা সত্য… আপনি কি প্রস্তুত এই রহস্যের জালে জড়িয়ে পড়তে?
হানিমুনে বিভীষিকা
কি গো ওঠো ওঠো জলপাইগুড়ি যে এসে গেল ব্যাগ গুলো বের করো, মিষ্টির ডাকাডাকিতে ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। সাইড লোয়ার বার্থ এ বসে জানালায় তাকিয়ে সকালের দৃশ্য দেখে মনটা খুশি হয়েগেল, সমতল মাঠে সারি সারি চা বাগান দ্রুত পেছনে ফেলে ছুটে চলেছে দার্জিলিং মেল। “সবে তো গুঞ্জরিয়া স্টেশন ছাড়ল, এখুনি ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই, এখনও ১ ঘন্টার পথ বাকি”, বললাম মিষ্টিকে। মিষ্টি আমার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী। বিগত ১ বছরের অপেক্ষা শেষে গত ২৪ জানুয়ারি আমি আর মিষ্টি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি। শুরু থেকেই আমার ইচ্ছে ছিল বিয়ের ঠিক পরেই আমরা হানিমুন-এ যাবো। পাহাড় আমাদের দুজনেরই ভীষণ পছন্দ, সেই মত বেরিয়ে পড়লাম দার্জিলিং এর উদ্দেশ্যে। এর আগে আমার বেশ কিছুবার পাহাড়ে যাওয়ার সুযোগ হলেও, মিষ্টির এই প্রথমবার, তাই উত্তেজনাও তুলনামূলক অনেকটা বেশি, আর সেই উত্তেজনার কারণেই ১ ঘণ্টা আগে থেকে উঠে বসে আছে ।
এই যা, নিজের পরিচয়টাই দেওয়া হয়নি, আমি বাবাই, পেশায় সেলস কনসালটেন্ট, আর নেশায় ভ্রমণপিপাসু। ট্রেনে থাকা বাকি যাত্রীদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে বাকি একঘন্টা কাটিয়ে সকাল ৯ টায় নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন এ ট্রেন থামতেই হুড়োহুড়ি লেগে গেল। স্টেশনের বাইরে আমাদের জন্য গাড়ি নিয়ে অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিল ড্রাইভার কাম গাইড কাম লক্ষ্য হোমষ্টে এর মালিক রুসাম রাই। আমাদের দেখে ই হাত তুলে ডাকল, ভাইয়া ইধার। স্বল্প উচ্চতা, মাথায় অল্প চুল, ছোট ছোট চোখ, অমায়িক একজন মানুষ এই রুসম, যেমন মিষ্টি তার ব্যবহার তেমনি মিষ্টি তার হাসি। আমাদের অভিবাদন জানিয়ে ব্যাগ গাড়িতে তুলে গাড়ি ছুটিয়ে দিল নর্থ বেঙ্গলের একটি ছোট্ট গ্রাম লেপচার উদ্দেশ্যে। শিলিগুড়ি ছাড়িয়ে যত এগোচ্ছি ততই পাহাড়ি ঠাণ্ডা হওয়া শরীর ছুঁয়ে যেতেই মন মুগ্ধ করা দৃশ্য চোখের সামনে ফুটে উঠল। দুদিকে বিশাল বিশাল সবুজ জঙ্গলে ঢাকা পাহাড় মাথা নিচু করে যেন আমাদেরই স্বাগতম জানাচ্ছে।
গোপালধারা টি এস্টেট এর কাছে এসে বাঁদিকে তাকিয়ে দেখি মিষ্টি আমার দিকের লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, তার কারণটা অবশ্য একটু পর বুঝতে পারলাম, গোপালধারা চা বাগানে অনেক পর্যটক নেপালি পোশাক পরে ছবি তুলছে, মিষ্টির এই দৃষ্টি ঐ ছবির তলার ই আবদার জানাচ্ছে। ঘড়িতে তখন দুপর ২টো, পেটও বলছে কিছু দিতে হবে। চা বাগানের কাছে একটা ছোট্ট খাবারের দোকানে গাড়ি থামিয়ে নেপালি পোশাক পরে, দুজনে মিলে জমিয়ে কিছু অসাধারণ ছবি তুললাম, সত্যি বলতে আমরা যে বাঙালি সেটা কিছুক্ষনের জন্যে ভুলেই গেছিলাম ঐ পোশাকের সৌন্দর্যে। যিনি মিষ্টিকে অত সুন্দর করে সাজিয়ে দিলেন, তিনি তো বলেই ফেললেন, আজ সরস্বতী পুজোর দিনে তোমাকে ঠিক মা সরস্বতীর মতই লাগছে।
গরম ভাত, ডাল আর ইয়াবড় একটা ডিমের ওমলেট সহযোগে দুপুরের খাওয়া শেষ করে আবার রওনা দিলাম গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। পশুপতি মার্কেট, অরেঞ্জ গার্ডেন নেপাল বর্ডার হয়ে সন্ধ্যে ৬টা নাগাত পৌঁছে গেলাম লেপচাজগত, আমাদের গন্তব্য। পৌঁছেই আলাপ হল হোমস্টের বাকি ২ সদস্যের সাথে, আরমান যে অতিথিদের দেখা শোনা করে, আর কোয়েল, কি দারুণ রান্না করে ছোট্ট মেয়েটি। রাস্তার উপর ৩ তলা একটি বাড়ি, নিচের তলায় ১ টা ঘর আর রান্না ঘর সাথে ৩টে টেবিল যুক্ত খাওয়ার জায়গা, দোতলা ও তিন তলায় ৩টি করে করে মোট ৭ টি ঘর। ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে উঠে ৩ তলায় আমাদের রুম। আরমান আমাদের রুম খুলে দিয়ে কফি আনতে চলে গেল। রুমে ঢুকে আমি আর মিষ্টি হতবাক হয়ে কিছুক্ষন দাড়িয়ে রইলাম, হানিমুন এ এসেছি জেনে রুসম তার পরিবার আমাদের রুম টা বেলুন দিয়ে কি অসাধারণ করে সাজিয়ে রেখেছে। কফি খেয়ে দুজনে জামাকাপড় পাল্টে সবে বসেছি, এমনসময় দরজায় ঠক ঠক শব্দ, রুসম এর গলা, “ভাইয়া ছদপে আইয়ে বোনফায়ার কা ইন্তেজাম কিয়া হে” । হুররে ইচ্ছে পূরণ, মিষ্টি রাস্তায় আসতে আসতে বলছিল, “কি গো রাতে আগুন পোহালে কেমন হয়”?
ছাদে পা রাখতে ই একসঙ্গে ৩টে কণ্ঠ কানে বেজে উঠলো “ হ্যাপি ম্যারিড লাইফ ভাইয়া আউর ভাবী” রুসম, আরমান আর কোয়েল দাড়িয়ে, একপাশে ইট দিয়ে সাজানো একটি ঢিপির উপর কাঠ জ্বলছে, আগুনের লাল আলোয় সবার মুখ লালচে আভায় রঙিন হয়ে আছে, আর একপাশে একটা ছাঁচের মধ্যে কয়লার আগুনে মাংস পুড়ছে, সামনে একটা ছোট্ট কেক, তাতে লেখা “হ্যাপি ম্যারিড লাইফ” এতকিছু দেখে ওদের প্রতি ভালবাসা যেন আরো ৪গুণ বেড়ে গেল। শুরু হল গানের আসর, রুসম দারুণ গান গায়, সাথে আরমানও, সবাই বলে আমি গানটা আমি ভালোই গাই, তাই আমিও যোগ দিলাম ওদের সাথে।
এখানে আর কোন গেস্ট নেই? জিগ্গেস করলাম রসম কে। রসম এর কাছে জানলাম, আমরা ছাড়া আরো ২ জন গেস্ট এসেছে একজন সকালে, আর একজন তার কিছু পরে। ওদেরও আমন্ত্রণ জানাতে বলে আরমান কে পাঠিয়ে আমরা মজে রইলাম আমাদের আসরে। একটু পরে দুজন ভদ্রলোক উপরে উঠে এলেন। একজন সুব্রত সরকার, বয়স ৬৫র কাছাকাছি, ছিমছাম চেহারা, টিকালো নাক, উচ্চতা প্রায় ৫ফুট৮ইঞ্চি, পরনে লাল সোয়েটার, গলায় ঝোলানো সাদা মাফলার, চোখে মোটা কাঁচের চশমা। একসময় দার্জিলিং এর কোন এক চা বাগানের ম্যানেজার ছিলেন, রিটায়ার করে এখন কোলকাতায় থাকেন, ডাক্তারের পরামর্শে হওয়া বদলের জন্য পুরোনো জায়গায় এসেছেন কিছুদিনের জন্য। আরেকজন বিশ্বজিৎ সেন, ৪০এর কাছাকাছি বয়স, মাঝারি গড়ন, শান্ত কিন্তু চোখে এক অদ্ভুত স্থিরতা, একটু বেশিই গম্ভীর। করমর্দন করে আমাদের শুভেচ্ছা জানিয়ে আগুনের এক পাশে নিজেদের আসন গ্রহণ করে বসলেন।
সুব্রত বাবু বললেন, “আহা, পাহাড়ে রাতের শীতের এক আলাদাই মজা আছে, তবে আজ যেন একটু বেশিই ঠান্ডা লাগছে”। সুব্রত বাবুর কথা শুনে, টেম্পারেচার চেক করে দেখি ২ডিগ্রি সেলসিয়াস, সত্যিই তো, এতক্ষণ আগুনের পাশে থাকায় ঠান্ডাটা টেরই পাইনি।
বিশ্বজিৎ বাবু সামান্য ঠোঁট বেকিয়ে হালকা হেসে বললেন, “ঠান্ডা তো লাগবেই, দার্জিলিং বলে কথা আর এই পাহাড়ের রাতগুলো”… জানেন সুব্রত বাবু, এখানে অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে!”আমি কৌতূহলী হয়ে বললাম, “রহস্য? কেমন রহস্য”? বিশ্বজিৎ বাবু একটু থেমে বললেন, “এই পাহাড়ের বুকে কত যে হারিয়ে যাওয়া গল্প আছে, তার ইয়ত্তা নেই! কত মানুষ নিখোঁজ হয়েছে, আবার কত ঘটনারতো কোনো ব্যাখ্যাই পাওয়া যায়নি”। সুব্রত বাবু একটু হেসে বললেন, “তা হলে তো আপনি এইসব রহস্য নিয়ে একটা গল্প লিখতে পারেন’। বিশ্বজিৎ বাবু একটু ভম্ভীর হয়ে বললেন, “গল্প নয়, এগুলো বাস্তব ঘটনা। আপনি জানেন হয়ত, কিছু বছর আগে এই পাহাড়েই এক ফটোগ্রাফার রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছিল”। খেয়াল করলাম, সুব্রত বাবুর মুখটা কয়েক মুহূর্তের জন্য কেমন ফেঁকাসে হয়েই, আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। আমার কৌতূহল হল। আমি বললাম, “তারপর কী হয়েছিল’? বিশ্বজিৎ বাবু একই রকম ভাবে বললেন, “লোকটা নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবারও দার্জিলিং ছেড়ে উধাও হয়ে যায়, কেউ জানেনা তারা এখন কোথায়,, যাক সেকথা, “তোমরা ভূতে বিশ্বাস করো”? কথাটা বললেন বললেন আমাদের উদ্দেশে। আমি একটু হেসে বললাম, “না, তবে রহস্যে একটু আধটু আগ্রহ আছে”। মিষ্টি অবশ্য একটু একটু ভয় পায়, কিন্তু বুদ্ধিমতি মেয়ে, সেটা প্রকাশ করলনা। সুব্রত বাবু বললেন, “আসলে রহস্য মানেই তো ধোঁয়াশা, যার আসল রূপ সবাই দেখতে পায় না”। তারপর আগুনের দিকে তাকিয়ে আপনমনে বললেন, “তবে একটা কথা ঠিক, দার্জিলিং-এর পাহাড় একবার যাকে আপন করে নেয়, তাকে ছাড়তে চায় না”!
রাত একটু বাড়তেই, আমি আর মিষ্টি উঠে ছাদের উত্তর-পূর্ব দিকে, যেদিক থেকে পূর্ণিমার গোল চাঁদটা, ঝলমল করছে আর আমাদের দেখছে, সেদিকটায় গিয়ে দাড়ালাম। পাহাড়ের ঠান্ডা বাতাস, পাহাড়ি গাছের সাথে ঘষা খেয়ে, মৃদু ঝরঝরে শব্দ করে আমাদের গায়ে এসে লাগছে, রসম এর গলায় “ সায়েদ কাভি মে কেহেসাকু” গান টা কান বেয়ে সোজা মনে এসে থেমে যেতেই একটা রোমান্টিক পরিবেশ অনুভব করলাম।
মিষ্টি আমার হাত ধরে বলল, “বাবাই, জানো, আজ আমার একটা স্বপ্ন পূরণ হল, পাহাড় খুব সুন্দর, কথাটা এতদিন শুধুই শুনেএসেছি অন্যদের মুখে, আজ তোমার হাত ধরে প্রথম অনুভব করলাম। এইভাবে তোমার হাত ধরে আমার বাকি স্বপ্নগুলোও পূরণ করতে চাই বাবাই। “তুমি খুশি হয়েছো”?? জিজ্ঞেস করলাম আমি। মিষ্টি মৃদু হেসে হেসে বলল, মনের খুশি যদি দেখানো যেত, তাহলে গোটা দার্জিলিং কে দেখতাম যে আমার বরমশাই আমাকে কতটা খুশি দিয়েছে এখানে নিয়ে এসে, তোমার কেমন লাগছে বললেনাতো”, আমি মুচকি হেসে বললাম, “মনে হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত খুশি এই মুহূর্তে লেপচা লক্ষ্য হোমস্টের ছাদে এসে উপস্থিত হয়েছে শুধু মাত্র আমারই জন্যে। মিষ্টি হেসে চাঁদের হালকা আলো গায়ে মেখে আমার বুকে মাথা গুঁজে বলল, আই লাভ ইউ বাবাই, “একটু বেশিই মিষ্টি শোনালো কথাটা”!
দূরে লেপচার পাহাড়ে ঝুলে থাকা বাড়িগুলোর মিটমিটে আলো যেন আকাশের তারার মতো ঝলমল করছে হালকা হাওয়ায় ওর চুল উড়ে আমার মুখ ছুঁয়ে যেতেই একটা অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করলাম, অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম মিষ্টির মিষ্টি মুখের দিকে। “এমন রাত যেন কোনোদিন শেষ না হয়,” মৃদুস্বরে বলল মিষ্টি। আমি হেসে বললাম, “তাহলে তো আমাদের এখানেই থেকে যেতে হয়”!ও খিলখিল করে হেসে বলল, “তা হলে চাকরি-টাকরি ছেড়ে এখানেই থাকো, আমি রোজ তোমার জন্য আদা দিয়ে দুধ চা বানিয়ে দেব!”
আমি মিষ্টির কোমল চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এই মেয়েটা আমার সব। পাহাড়ের ঠান্ডা রাতের মাঝেও মনে হচ্ছিল আমি উষ্ণতায় ডুবে যাচ্ছি।
হঠাৎ, মিষ্টি আলতো স্বরে বলল, “বাবাই, একটা কথা বলো… তুমি সত্যি আমায় এত ভালোবাসো?” আমি ওর হাতটা শক্ত করে ধরে বললাম, “ভালোবাসি বললে কম বলা হবে, তুমি আমার জীবন, আমার গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়!”
ওর ঠোঁটের কোণে একটা মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল তারপর আমার কাঁধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করল। আমি বুঝতে পারলাম, ও এই মুহূর্তটাকে অনুভব করছে, ঠিক যেমন আমি করছি। “তুমকো পায়া হে তো জয়েসে খোয়া হু” আরমান এর গলায় ভেসে এল গানটা, কয়েক মুহূর্ত কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম দুজনেই।
সম্ভিত ফিরল রসম এর ডাকে, “ভাইয়া ডিনার রেডি হে, নিচে আজাইয়ে” ।
রুটি চিকেন রেজালা আর আমাদের জন্য আনা কেক সহযোগে ডিনার শেষ করে সবাইকে শুভরাত্রি জানিয়ে আমরা শুতে চলে এলাম। সারাদিন পাহাড়ি রাস্তায় ঘোরাঘুরি তে দুজনেই বেশ ক্লান্ত ছিলাম, সোয়া মাত্রই ঘুমিয়ে পড়লাম।
সকালে ঘুম ভাঙল মিষ্টির ডাকে। “বাবাই, উঠো! বাইরে কিসের কোলাহল, শুনতে পাচ্ছো?” ঘুম জড়ানো চোখে ব্যালকনির দরজা খুলে নিচে তাকিয়ে দেখি, হোমস্টের সামনে লোকজন জড়ো হয়েছে। একটা উত্তেজনার পরিবেশ! আমি নিচে নেমে গেলাম। সেখানে যা দেখলাম, তাতে মুহূর্তেই আমার ঘুম উধাও হয়ে গেল।
সুব্রত সরকার—যিনি গতকাল রাতেও সুস্থ ছিলেন, ছাদে আমরা একসাথে কত সুন্দর সময় কাটিয়েছি, একসাথে ডিনার করেছি, তিনি মৃত। সকালে কফি দিতে গিয়ে অনেক ডাকাডাকিতেও দরজা না খোলায় আরমান রসম কে সাথে নিয়ে দরজা ভেঙে মৃতদেহ আবিষ্কার করে, প্রথমে দেখে ঘুমন্ত মনে হলেও কাছে যেতেই বোঝা যায়, দেহ ঠাণ্ডা, নিশ্বাস বন্ধ, মুখটা অদ্ভুতরকম ফ্যাকাশে, আর গলার কাছে অল্প লালচে দাগ। কি করবে বুঝতে না পেরে রসম আর আরমান প্রতিবেশীদের ডেকে ঘটনা জানায়। আশপাশে ফিসফিসে গলায় শোনা গেল, “গলা দাবাকে মারা হে কিসিনে”। পাশে তাকিয়ে দেখি, মিষ্টি কৌতূহলী দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে আছে, বুঝলাম ওর মনেও একই ভাবনা। কানের কাছে মুখ নিয়ে মৃদু কণ্ঠে বললাম, “কেউ গলা টিপে খুন করলে সাধারণত সেই দাগ গভীর হয়, এই দাগটা এতটাও গভীর নয়, গলা টিপে খুন হয়েছে বলে মনে হয়ননা, আর তাছাড়া বয়স্ক মানুষ, হার্ট অ্যাটাক ও তো হতেপারে, পুলিশ এসে যা করার করবে, আমাদের এত না ভাবলেও চলবে”।
পুলিশে খবর দেওয়া হলো। আধঘণ্টার মধ্যেই এসে উপস্থিত হলেন ইন্সপেক্টর অভীক রায়। আমায় দেখেই একগাল হেসে বলল, “আরে বাবাই যে, তুই এখানে? ঘুরতে এসেছিস”? মিষ্টির সাথে পরিচয় করিয়ে বললাম, “শুধু ঘুরতে না গো, হানিমুনে”। অভিকদার সাথে পরিচয় হয়েছিল, গত বছর কলকাতা বই মেলার সিকিউরিটি রুমে, একটা ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ চেক করার জন্য আমাকে ডাকা হয়েছিল, তদন্ত সূত্রেই খুব ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে অভীকদার সাথে। মিষ্টিভাসী, শান্ত অথচ বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা, প্রতিদিন জিম করে, তা বাইসেপ দেখলেই বোঝা যায়। “কি বুঝছ অভিকদা, সাধারণ মৃত্যু? না খুন”? মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করলাম। “দেখেতো হার্ট অ্যাটাকই মনে হচ্ছে, পোস্টমর্টেমে পাঠাতে হবে, রিপোর্ট এলেই বোঝা যাবে, তোদের এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনো প্রয়োজন নেই, হানিমুনে এসেছিস, চুটিয়ে প্রেম কর, বাড়ি ফিরে দায়িত্বের বোঝা মাথায় চেপে বসবে, তখন আর এই দিনগুলো চাইলেও পাবিনা, আর হ্যাঁ, কোনোরকম দরকার পড়লে ফোন করতে দ্বিধা করিসনা”, বলে মৃতদেহ গাড়িতে তুলে চলে গেল।
পুলিশ চলে গেলে, রসম পাশে এসে দাড়ালো, করুন মুখে বলল, “ইয় কেয়া হোগায়া ভাইয়া, আভি আপলোগ আয়ে, আউর দেখিয়ে কেয়া ঝামেলা হোগায়া? অব মে কায়েসে আপকো ঘুমাউ”? ওর কাঁধে হাতদিয়ে সব ঠিক হয়ে যাওয়ায় আশ্বাস দিয়ে বললাম, “চিন্তা মত কারো, মেরেলিয়ে দুশরা কই গাড়ি ম্যাঙ্গাদো, পুলিশকো তুমহারি মদত চাহিয়ে হোগা, হাম শ্যামতাক ওপাস আজয়েঙ্গে”। রসম গাড়ির ব্যবস্থা করতে চলে গেল, আমি আর মিষ্টি চলেগেলাম আমাদের রুমে। স্নান সেরে গরম জামাকাপড় পরে রেডি হয়েছি, এমন সময় আরমান এসে খবর দিল যে, আমাদের জলখাবার আর গাড়ি, দুটোই রেডি। আলু পরোটা, টক দই, আর কিসের যেন একটা আচার দিয়ে সকালের খাবার খেয়ে রওনা দিলাম পাহাড়ের কোলে হারিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। নতুন ড্রাইভারটাও খানিকটা রসম এর মতোই দেখতে, আলাপ করে জানলাম সে রসম এর খুঁড়তোত ভাই, নাম ওরাং।
লেপচা থেকে বেরিয়ে সোজা থামলাম ঘুম স্টেশনে। স্টেশনটা ছোট্ট, কিন্তু একটা সিনেমার সেটের মতো সুন্দর! কাঠের বেঞ্চ, পুরনো সিগন্যাল পোস্ট, আর পাহাড়ি আবহে মোড়া এক আদিম সৌন্দর্য। টয় ট্রেন চড়ার ইচ্ছে আমাদের দুজনেরই ছিল, তাই ওরাংকে বললাম, “আপ দার্জিলিং স্টেশনপে হামারেলিয়ে ইন্তেজার কিজিয়ে, ট্রেন সে উতরকে হাম ওহী মিলেঙ্গে”। ওরাং ঘাড় নেড়ে চলে গেল।
অদ্ভুত একটা ভোঁ শব্দে পেছনে চমকে তাকিয়ে দেখি, একটা ছোট্ট স্টিম ইঞ্জিন, ধোঁয়া উড়িয়ে ছোট্ট নীল হলুদ রঙের ট্রেনটাকে টানতে টানতে স্টেশনে নিয়ে আসছে। ম্যা হু না, সিনেমায় শাহরুখ খানের এন্ট্রির সিনটা মনে পড়ে গেল। দুটো টিকিট কেঁটে আমি আর মিষ্টি ট্রেনের একটা কামরায় জানালা অধিকার করে বসলাম। আমাদের সিটটা একেবারে কোণের দিকে, জানালাটা হাট করে খোলা। বাইরে পাহাড়ি ঠান্ডা বাতাস, আর তার সাথে টিপটিপ রোদের আলো গায়ে এসে লাগতেই নিজেকে কেমন যেন রোমান্টিক সিনেমার মুখ্য চরিত্রের মতো মনে হতে লাগল।
ভোঁ শব্দ করে ট্রেনটা ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল। ধোঁয়ার গন্ধ, পুরনো রেললাইন আর কাঠের কামরার আওয়াজ মিশে একটা নস্টালজিক অনুভূতি আমায় ঘিরে ফেলল।
মিষ্টি হাসিমুখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “বাবাই, তুমি জানো? এই টয় ট্রেন কিন্তু দার্জিলিং-এর অন্যতম ঐতিহ্য! সেই ব্রিটিশ আমল থেকে চলছে”। আমি হেসে বললাম, “হ্যাঁ গো, জানি, আর এই ট্রেনে বসে পাহাড় দেখার অভিজ্ঞতা যে কতটা অসাধারণ, তা আজ বুঝতে পারছি”।
ট্রেন ধীরে ধীরে আঁকাবাঁকা রাস্তার উপর দিয়ে কেঁপে কেঁপে চলছে, জানালার বাইরে, পাহাড়ে সবুজের ছোঁয়া, একপাশে গভীর খাদ, অন্যদিকে পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা ছোট্ট ছোট্ট বাড়ি, কোথাও কোথাও আবার গাছে ঝুলে আছে লাল-হলুদ পতাকা, কোথাও আবার রাস্তায় মাঝে দাড়িয়ে পাহাড়ি বাচ্চারা হাসিমুখে দুহাত তুলে আমাদের দিকে হাত নেড়ে আমাদের আনন্দের সঙ্গী হচ্ছে।
মিষ্টি আমার হাতটা ধরে বলল, “তুমি জানো, ছোটবেলা থেকে আমার স্বপ্ন ছিল, যদি কোনোদিন দার্জিলিং আসতে পারি, তাহলে একবার এই টয় ট্রেনে নিশ্চয়ই চড়ব”। আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, “ব্যাস হয়ে গেল স্বপ্ন পূরণ” মিষ্টি হালকা হেসে বলল, “হ্যাঁ গোঁ, তবে একটা জিনিস এখনো বাকি রয়ে গেছে”, আমি অবাক হয়ে বললাম, “আচ্ছা? সেটা কী”? ও একটু বেশিই আদো আদো স্বরে বলল, “আমার আশা ছিল তুমি আমাকে একটা সারপ্রাইজ দেবে”। আমি হেসে বললাম, “তুমি সারপ্রাইজড হওনি”? এইযে আমাদের জন্য রুমটা কত সুন্দর করে সাজানো ছিল, রাতে ছাদে কেক কাটিং করলাম”
“ধুর সেতো ওরা করেছে আমাদের জন্য, তুমি তো আমায় দাওনি” -ভুরু কুঁচকে বলল কথাটা। মিষ্টির মুখটা যেন একটু বেশিই মিষ্টি দেখাচ্ছিল। হেডফোন টা ওর কানে গুজে দিতে দিতে বললাম, “আচ্ছা চোখ বন্ধ করে এটা শোনো”। পকেট থেকে মোবাইল ফানটা বের করে, ওর জন্য নিজের কণ্ঠে রেকর্ড করা গানটা চালিয়ে দিলাম— “তু…. মেরি জিন্দেগি হে” মিষ্টি চোখ বন্ধ করে শুনতে লাগল, খেয়াল করলাম মিষ্টির চোখের কোণটা হালকা হালকা ভিজে উঠেছে, ও কাঁদছে, তবে ওর এই কান্নায় দুঃখ পেলাম না, কারণ কান্নাটা যে খুশির তা বুঝতে কোন অসুবিধা হচ্ছিলনা। গানটা শেষ হতেই ওর মুখে একটা মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। চোখ মুছতে মুছতে বলল “বাবাই! এটা তুমি কখন রেকর্ড করলে”। আমি মুচকি হেসে বললাম, “প্রিয় মানুষের জন্য কিছু করতে সময় লাগে না!” একগাল হেসে আমার কাঁধে মাথা রাখল মিষ্টি। ট্রেনের মৃদু দুলুনির মাঝে আমরা দুজন একে অপরের দিকে চেয়ে রইলাম।
বাতাসিয়া লুপ কে একটা চক্কর দিয়ে, ২-৩টে চা বাগান ও রডোডেনড্রন এর জঙ্গল এর মধ্যে দিয়ে, সোনাদা আর জোড়বাংলো স্টেশন পার করে যখন দার্জিলিং স্টেশনে ট্রেন থামল, তখন দুপুর ২.৩০টা। গ্লিনারিস এ দুপুরের খাওয়া শেষ করে, মল রোড হয়ে আরো ৪-৫ জায়গায় ঘুরে সন্ধ্যে ৭টায় লেপচায় ফিরে এলাম।
হোমস্টে তে ঢুকেই দেখি অভিকদা হোমস্টে তে উপস্থিত, সবার সাথে কথা বলছে। আমি কৌতূহলী স্বরে জিগ্গেস করলাম, “কি খবর অভিকদা, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট কি বলছে”? আমাকে বাইরে ডেকে অভিকদা বলল, “রিপোর্ট তো বলছে হার্টঅ্যাটাক, তোর কি মনে হয়, তুই তো গত রাতে এখানেই ছিলি, কিছু অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল”? আমি একটু ভেবে বললাম, “না, তেমন কিছু তো মনে হয়নি, কাল অনেকরাত পর্যন্ত সুব্রত বাবু আমাদের সাথেই ছিলেন, আমরা একসাথে বোন ফায়ার করে, ডিনার করে তারপর যে যার রুমে চলে এসেছি। ঠিক আছে, “কোন আপডেট পেলে জানাবো”, বলে অভিকদা চলে গেল।
আমার মনে এবার একটা অস্বস্তি হতে হতে লাগল, সত্যিই তো, কাল রাতের সুস্থ সবল মানুষটা হঠাতই হার্টঅ্যাটাক এ মারা গেলেন?
রাত ৯টায় ডিনার করে আমরা রুমে চলে এলাম। কিন্তু মনটা কেমন খচখচ করতে লাগল, এক অদ্ভুত অস্বস্তি হচ্ছে যেন। বিছানায় শুয়ে এটাই ভাবছি, হঠাৎ মিষ্টি বলে উঠল, “তুমি খেয়াল করেছ, বিশ্বজিৎ বাবু কেমন অদ্ভুতভাবে সুব্রত বাবুর নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে ছিল সকালে, দেখে মনে হচ্ছিল যেন সুব্রত বাবুর মৃত্যুতে তিনি খুশি হয়েছেন”। আমি ধীরে ধীরে মাথা নাড়লাম, বললাম, “আমিও লক্ষ্য করেছি, তবে সত্যিই কি এটা খুন? বিশ্বজিৎ বাবু কেনইবা খুন করতে যাবেন বলত? কি উদ্দেশ আছে তাঁর”?
পরদিন সকালে আমি আর মিষ্টি সকালের জলখাবার খাচ্ছি, হঠাৎ দেয়ালে টাঙানো একটা ছবি দেখে থমকে গেলাম। ছবিতে এক পাহাড়ি গ্রুপের ছবি, নিচে মার্কার দিয়ে লেখা “১৯৯৫, লেপচা”। কিন্তু আমার চোখ আটকাল এক ব্যক্তির ওপর। মিষ্টিকে ছবিটা দেখিয়ে বললাম, “ডানদিকে ৪ নাম্বার লোকটাকে দেখো, মুখটা বিশ্বজিৎ বাবুর সঙ্গে কেমন অদ্ভুত মিল আছে না”? ছবিটা ভালো করে দেখে ভুরু কুঁচকে মিষ্টি বলল, “হ্যাঁ এতো বিশ্বজিৎ বাবুই বটে, কিন্তু বিশ্বজিৎ বাবুর ছবি এখানে কি করে এল? তবে কি উনি এখানকারই লোক? উনি কি সুব্রত বাবুকে চিনতেন? বিশ্বজিৎ বাবুই খুনি নন তো”? রুসামে কে ডেকে জিগ্গেস করলাম ছবিটার ব্যাপারে। ও ছবিটা দেখে কপালে একটু ভাঁজ ফেলে বলল, “ইয়ে তো মেরে পাপাকে টাইম কা ফটো হে, সাব পাপাকে দোস্ত হে, একসাথ টি স্টেট মে কাম করতেথে, মাগার আপ কিউ পুছে”? “কুছ নেহি”, বলে আবার খাওয়ায় মনোনিবেশ করলাম। আমার সন্দেহ বাড়ছিল। সুব্রত বাবু ছিলেন চা বাগানের ম্যানেজার, বিশ্বজিৎ বাবু চা বাগানের কর্মচারী, বিষয়গুলো কেমন মিলে যাচ্ছে, তাহলে মিষ্টির ধারণাই সঠিক? খুনটা বিশ্বজিৎ বাবুই করেছেন? আমি তক্ষুণি পুরো বিষয়টা অভিকদা কে জানালাম। ফোনের ওপার থেকে অভিকদা বলল, “বলছিস কি! তুই এখুনি কাউকে কিছু বলিসনা, আমি এখন কালিম্পং এ আছি, রাতে এসে ধরছি ব্যাটাকে”। এবারে একটু হেসে বলল, “হানিমুনের ইতি গজ তো? রহস্যে ঢুকেই পড়লি”। আমি একটু হেসে ফোনটা রেখে আরমানকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমনে আয়েসা কুছ দেখা জো তুমহে আজিব লাগা”? একটু ভেবে বলল, “আয়েসা তো কুছ নেহি দেখা, মাগার হা, কাল শাম কো এক আদমী আয়াথা, নিউ লাইফ হোমস্টেমে রুকে হে, কেয়া নাম বাতায়া,, একটু মাথা চুলকে নিয়ে বলল, হা রবি ওঝা”। আমি আর মিষ্টি মুখ চাওয়া চাওয়াই করলাম। এই রবি ওঝার সাথে একবার কথা বলা দরকার।
নিউ লাইফ হোমস্টের মালিক আপনিল তামাং, বয়স ৪০ কি ৪৫, বেটে খাটো, কিন্তু পেটানো চেহারা, একাই হোমস্টের দেখাশুনা করে, নেহাতই ভদ্র লোক, অল্প সময়ের মধ্যেই তার সাথে বেশ খাতির জমিয়ে ফেললাম, তার কাছেই জানলাম রবি বাবু কিছুক্ষন আগে হোমস্টে থেকে একটু দূরে পাইন বনের ছবি তুলতে গেছেন, মিনিট তিনেক এর হাঁটা পথ, “এটাই সঠিক সময় ওনার সাথে কথা বলার”। মিষ্টিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম পাইন বনের উদ্দেশ্যে। ১০ ২০ ফুট উঁচু উঁচু এক একটা গাছ, বনের শুরুটা তেমন গভীর না হলেও, যত এগোতে থাকলাম, জঙ্গল ততই ঘন হতে শুরু করল, রোদের আলো প্রায় ঢোকেনা বললেই চলে, তার উপর ঘন কুয়াশা পুরো জঙ্গলটা চাঁদরের মতো জড়িয়ে রেখেছে, বেশ গা ছমছমে পরিবেশ। একটু দূরেই দেখতে পেলাম একজন লোক হাঁটু মুড়ে আকাশের দিকে ক্যামেরা তাক করে বসে আছে, ইনিই যে রবি ওঝা তা চিনতে অসুবিধা হলনা। কিভাবে কথা শুরু করি ভাবছি, এমন সময় মিষ্টি বেশ জোরেই লোকটার উদ্দেশ্যে বলে উঠল, “দাদা আমাদের একটা ছবি তুলে দেবেন”? দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে এগিয়ে গেলাম রবি বাবুর দিকে। বছর ৩৫ বয়স, প্রায় ৬ফুট লম্বা, পরনে সাদা হুডি, চোখে রিমলেস চশমা, হাতে Nikon Z6 ক্যামেরা, সব মিলিয়ে বেশ স্মার্ট ব্যক্তিত্ব। কাছে যেতেই একগাল হেসে নিজের পরিচয় দিয়ে তিনি বললেন, “কি, হানিমুনে আসা হয়েছে বুঝি? কিভাবে বুঝলাম ভাবছেন তো? আসলে ম্যাডামের সিঁথির সিঁদুরটা এখনো কাঁচা রয়েছে, সদ্য বিবাহিতারাই সাধারণত এমন করে সিঁদুর পরে কিনা”। আমি হাত বাড়িয়ে করমর্দন করে নিজেদের পরিচয় দিয়ে মৃদু হেসে বললাম, “একদম ঠিক বলেছেন, গত সপ্তাহেই আমাদের বিয়ে হয়েছে, তা আমি কি ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার”? “ফটোগ্রাফার, তবে ওয়াইল্ড লাইফ নয়, ওনলি নেচার, যদিও এটা আমার প্রফেশন নয়, আমি একজন ট্রেডার ইনভেস্টর, ফটোগ্রাফীর নেশা আমার ছোট বেলা থেকেই, আমার বাবা ছিলেন ফটোগ্রাফার, তার কাছেই ফটোগ্রাফি শেখা, তা একটু চা চলবে নাকি? জঙ্গলের বাইরে একটা চায়ের দোকান আছে, দারুণ চা বানায়, চলুন চা খেতে খেতে আড্ডা দেওয়া যাক” বললেন রবি বাবু। বেশ কিছু সুন্দর ছবি তুলে আমরা চায়ের দোকানের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে রবিবাবু বললেন, “কি হলো বলুনতো সুব্রত বাবুর সাথে, সুস্থ মানুষটা হঠাৎ করে হার্টঅ্যাটাকে মারা গেলেন”! মিষ্টি কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, “বাবাই, তোমার খাটনি লোকটা নিজেই কমিয়ে দিল”, আমি মিষ্টির হাতে মৃদু চাপ দিয়ে রবি বাবুকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি সুব্রত বাবুকে চিনতেন”? একটুক্ষণ চুপ থেকে রবিবাবু বললেন, “না আগে পরিচয় ছিলনা, তবে পরশু বিকেলে এই চায়ের দোকানেই ওনার সাথে আলাপ হল, নিতান্তই ভদ্রলোক ছিলেন সুব্রত বাবু, কত গল্প করলেন, ছবিও তুলে দিলাম কয়েকটা, উনি একসময় দার্জিলিং এই থাকতেন, তবে একটা কথা আপনাকে বলি, সুব্রত বাবুই বললেন কাল, আপনাদের হোমস্টেতে আরেকজন যিনি এসেছেন, ওই বিশ্বজিৎ সেন, লোকটা মোটেও সুবিধার নয়, পূর্ব পরিচয় না দিলেও কর্ম সূত্রে সুব্রত বাবুর সাথে কি একটা বিষয় নিয়ে বচসা হয়েছিল ১৫ বছর আগে… কার মনে কি আছে কে বলতে পারে। ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বললাম, “পুলিশ কে কথাটা জানিয়েছেন”? “কাল আমি ফিরব, শুধু শুধু ঝামেলায় জড়াতে চাইনা, তাই আর… আপনাদেরও এসবের মধ্যে না পরাই ভালো”। “একদম ঠিক বলেছেন”, বলে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা আপনি কাল সুব্রত বাবুর সাথে দেখা করতে গেছিলেন”? কিছুক্ষনের জন্য রবি বাবুর মুখের ভাব গম্ভীর হয়ে আবার সাধারণ হয়ে গেল, “বলল, উনি যেতে বলেছিলেন বটে, তবে যাওয়া হয়ে ওঠেনি, কেন বলুনতো? না এমনি বলে, মৃদু হেসে রবি বাবুকে বিদায় জানিয়ে আমি আর মিষ্টি ফেরার পথ ধরলাম।
হাঁটতে হাঁটতে মিষ্টি জিজ্ঞেস করল, “কি বুঝলে”? “এখনও কিছু বুঝিনি, তুমি কিছু বুঝলে”? পাল্টা জিজ্ঞেস করলাম। উত্তেজিত স্বরে মিষ্টি বলল, “দুটো বিষয় লক্ষ্য করলাম, প্রথমত, রবি বাবুর কথায় কিছু অসঙ্গতি আছে, যেমন, সুব্রত বাবু, বিশ্বজিৎ সেন সম্বন্ধে এতো কিছু ওনাকে বললেন? কাল রাতে সুব্রত বাবু অন্তত ৩ ঘণ্টা আমাদের সাথে ছিলেন, গুণে গুণে ৪ ৫ টা কথা কথা বলেছেন হয়তো”, “আর দ্বিতীয়ত ওনার কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে বিশ্বজিৎ বাবুর কাছে খুন করার যথেষ্ট কারণ থাকতে পারে, ছবি দেখে তো বঝাই গেল যে উনি এখানেই থাকতেন, হতে পারে ওরা একই চা বাগানে কাজ করতেন, বিশ্বজিৎ বাবুর মুখ দেখে তো খুশি মনে হল”, “শুধু একটা কথা মাথায় আসছেনা, রবি বাবু তোমাকে এতো কিছু কেন বললেন, তাও আবার নিজেথেকেই”। একটু চুপ করে থেকে বললাম, “কিছু মনে হয়েছে নিশ্চই, তাই বলেছেন হয়তো”। রাগী দৃষ্টি আমার দিকে নিক্ষেপ করে গট গট করে এগিয়ে গেল মিষ্টি, বুঝলাম উত্তরটা ঠিক পছন্দ হয়নি ওর।
হোমস্টেতে যখন ফিরলাম তখন দুপুর ২.৩০টা, দরজার সামনে রসম আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছে, চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কাহা গিয়েথে? আপকা ফোন নেহি লগরাহাথা, জো সাব হোরাহাহে, আপ দোনো থোড়া সামহাল কে রাহিয়েগা, চালিয়ে খানা রেডি হে”, বলে রান্না ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দুপুরের খাওয়া শেষ করে রুমে গিয়ে মিষ্টি কম্বলটা টেনে শুয়ে পড়ল, বুঝলাম রাগ এখনও ভাঙেনি, আমিও সেই সুযোগে ঘর থেকে বেরিয়ে আরমান কে সাথে নিয়ে সুব্রত বাবুর ঘরে গিয়ে হাজির হলাম, যদি কিছু পাওয়াযায় সেই আশায়, এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে তেমন কিছুই পাওয়া গেলনা, মাথাটা কেমন ভোঁ ভোঁ করছে, একটা সূত্র দরকার। হঠাৎ আরমান বলে উঠল, “ও কেয়া হে”? ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে ব্যালকনির কার্নিশে চোখ পরতেই চমকে উঠলাম, কি একটা জিনিস রোদের আলো পরে চক চক করছে, একটা ছোট্ট কাঁচের শিশি, কোন লেবেল নেই। শিশিটা পকেটে পুরে, আরমান কে চলে যেতে বলে, আমি বিশ্বজিৎ বাবুর ঘরে গেলাম। আমায় দেখে একটু অবাক হয়ে বললেন, “আসুন আসুন, হঠাৎ এই সময় কি মনেকরে”? একটু হেসে বললাম, “তেমন কিছু না, একটা কথা জানার ছিল”, চেয়ার টেনে বসতে দিয়ে বিশ্বজিৎ বাবু বললেন, “সুব্রত বাবুর বিষয়ে”? ঘাড় নেড়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা আপনি সুব্রত বাবু কে আগে থেকে চিনতেন”? গম্ভীর স্বরে বললেন, “হ্যাঁ চিনতাম, আমি ওনার কোম্পানিতেই চাকরি করেছি ৩ বছর, বছর ১৫ আগে ওনার একটা সিদ্ধান্তে সম্মতি না দেওয়ায় উনি আমাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন, তারপর আবার এখানে দেখা, উনি সম্ভবত আমায় চিনতে পারেননি”। “কি সিদ্ধান্ত”? জিজ্ঞেস করলাম, ভুরু কুঁচকে একটু রাগী স্বরে বললেন, “ফ্যাক্টরি বাড়ানোর জন্য কিছু জমি দরকার ছিল, যদিও সেটা যেকোনো জমি হলেই চলত, কিন্তু সুব্রত বাবুর জেদ, পুরোনো ফ্যাক্টরির লাগোয়া জমিটাই ওনার চাই, সেখানে একটি ৪জনের পরিবার বাস করত, পরিবারের কর্তা খুব ভালো মানুষ ছিলেন জানেন, সাতে পাঁচে থাকতেননা, পেশায় ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার, সুব্রত বাবুর জেদের কারণে, গোটা পরিবারটা যে কোথায় উধাও হয়ে গেল তা আজও রহস্য”। একটু চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা আপনি রবি ওঝাকে চেনেন? ওই আমাদের পাশের হোমস্টে তে উঠেছেন”। না সূচক মাথা নাড়লেন। ওনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে উঠে পড়লাম। সিঁড়ি দিয়ে নেমে সোজা চলে গেলাম, এই পাইন বনের বাইরের চায়ের দোকানে। দোকানে কোন খদ্দের নেই, “আচ্ছা দাদা আজ সকালে যিনি আমার সাথে বসে চা খাচ্ছিলেন তিনি পরশু আর একজন ভদ্রলোকের সাথে এখানে এসেছিলেন”? জিজ্ঞেস করলাম দোকানদারকে। দোকানদার মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললেন, “সারাদিনে কত লোকই তো আসে, মনেরাখা…, হ্যাঁ মনে পড়েছে, একজন লোক ওনার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন বটে, কিছুক্ষন ছিলেন তারপর চলে গেলেন”। দোকানদারকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফিরতে উদ্যত হয়েছি, এমন সময় মনে হল কেউ যেন আমায় আড়াল থেকে ফলো করছে। ফিরতে ফিরতে অভিকদা কে ফোন করলাম, দ্বিতীয়বার ফোনটা বাজতে ওপার থেকে অভিকদার গলা ভেসে এল, “হ্যাঁ বল, আমি তোর ওখানেই আসছি”। অভিকদাকে থামিয়ে তুলনামূলক গলার স্বর নিচু করে বললাম, “শোনো তোমার এখানে আসার দরকার নেই, আমি তোমার কাছে একটা শিশি পাঠাচ্ছি, ওটা পরীক্ষা করে দেখতে হবে, আর তুমি আজ সন্ধ্যে ৬টা নাগাত মল রোডের উল্টোদিকে একটা ছোট্ট বইয়ের দোকান আছে ওখানে আমার জন্য অপেক্ষা করো, আমার উপর হামলা হতে পারে”। উত্তেজিত স্বরে অভিকদা বলল, “বলছিস কি, রহস্য সমাধান করে ফেলেছিস মনে হচ্ছে? খুলে বল”। “এখন বলা যাবেনা, রাতে বলব সব, এখন রাখি” বলে ফোন রেখে হোমস্টেতে ফিরে আরমান এর হাত দিয়ে ওই শিশিটা অভিকদার কাছে পাঠিয়ে দিলাম। রুমে গিয়ে দেখি মিষ্টি কার সাথে ফোনে কথা বলছে, আমায় যেন দেখতেই পেলনা। “চট করে রেডি হয়ে নাও বেরতে হবে”, বলে আমি রেডি হতে শুরু করলাম। নিমেষের মধ্যে মিষ্টির চেহারা পাল্টে গেল, বলল, “কোথায় যাচ্ছি? তুমি খুনিকে ধরে ফেলেছ”? “প্রায় ধরে ফেলেছি, এবার শুধু প্রমাণের অপেক্ষা, আর দেরি করা ঠিক হবেনা, বলে আমি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম”। “কোথায় যাচ্ছি সেটাতো বলো”, বলে আমার পেছনে পেছন মিষ্টিও সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো। ওরাং কে ডেকে গাড়িতে উঠতে উঠতে বললাম “মল রোড”। গাড়ি এসে থামল পুরোনো এক বইয়ের দোকানে, দোকানটা ছোট, পুরোনো বইয়ে ঠাসা, নতুন বই একটাও আছে বলে মনে হলনা, দোকানদারের বয়স প্রায় ৭৫। আমি দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনার কাছে ১৯৯৫ সালের জমি সংক্রান্ত কোনো খবর আছে?” বৃদ্ধ লোকটা একটু ভেবে, কিছু কাগজ ঘেঁটে একটা পুরনো নিউজ ক্লিপিং বের করে আমার হাতে দিলেন, আমি পড়তে শুরু করলাম— “টি এস্টেট এর হাতে জমি হারিয়ে স্থানীয় পরিবার নিখোঁজ” গৃহ কর্তা একজন ফটোগ্রাফার, নাম সুনীল ওঝা”। আমি আর মিষ্টি চোখাচোখি করলাম। বিশ্বজিৎ বাবু মিথ্যে বলেননি। ঠিক তখনই, দোকানের বাইরে কেউ আমাদের আড়াল থেকে লক্ষ্য করছে বলে মনে হল। বৃদ্ধকে ধন্যবাদ জানিয়ে তাড়াতাড়ি সেখান বেরিয়ে পড়লাম। ঘন কুয়াশা আর ঠান্ডায় রাস্তা বেশ ফাঁকা। মল রোড ছাড়িয়ে কাঁচা রাস্তায় নামতেই পিছন থেকে একটা কালো ছায়া দ্রুত আমাদের দিকে ছুটে এল! মিষ্টি চিৎকার করে উঠল, “বাবাই সাবধান!” আমি ঘুরতেই দেখি, একজন লোক মাফলারে মুখ ঢাকা, হাতে একটা লোহার রড নিয়ে আমার মাথায় আঘাত করতে যাবে, এমন সময় মিষ্টির ধাক্কায় আমি একপাশে ছিটকে পড়লাম, মিষ্টির উপস্থিত বুদ্ধিতে সে যাত্রায় বেঁচে গেলাম বটে, তবে বেশিক্ষণের জন্য না! আমি উঠে দাঁড়ানোর আগেই লোকটা আবার ছুটে এলো। ঠিক তখনই.. গুলির কানফাটা শব্দে থমকে দাড়িয়ে গেল লোকটা “অস্ত্র ফেলে দিন, হাত উপরে তুলুন, পুলিশ”। অভীকদা দলবল নিয়ে হাজির! বন্দুক তাক করতেই মুখোশধারী লোকটা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করল, কিন্তু সে চেষ্টা বৃথা, ততক্ষণে পুলিশ পেছন থেকে জাপটে ধরে ফেলেছে লোকটাকে। পুলিশ লোকটার মুখোশ খুলতেই সবাই হতবাক! আপনিল তামাং, নিউ লাইফ হোমস্টের মালিক।
আমি বললাম, “সুব্রত বাবুকে আপনিই বিষ দিয়েছিলেন, তাই না?” আপনিল তামাং ফোঁস ফোঁস করতে করতে বলল, “হ্যাঁ, আমি দিয়েছি… কারণ সে আমার বন্ধু ও তাঁর পরিবারকে ধ্বংস করেছিল! দেবতার মত মানুষ ছিলেন আমার বন্ধু সুনীল, একসময় নর্থ বেঙ্গলের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে নানান পশু পাখির ছবি তুলতেন, অসাধারণ ফটোগ্রাফার ছিলেন তিনি। কিন্তু সুব্রত সরকার নিজের স্বার্থে সুনীলকে প্রতারক সাব্যস্ত করে, একরকম জোর করে ওঁর জমি কেড়ে নেয়, মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে তিনি আত্মহত্যা করেন” রবি, ওঁর মা আর ২ বছরের বোনকে নিয়ে এখান থেকে পালিয়ে কলকাতায় চলে যায়”। “আমি জানতাম, পুলিশ কখনো সুব্রতকে শাস্তি দেবে না। তাই আমি নিজেই ওকে শেষ করে দিলাম”। আপনিল থামল, চোখে যেন আগুন জ্বলছে ওর, দমকা হাওয়ার মতো নিশ্বাস প্রশ্বাস চলছে তার। “তারমানে আপনি আর রবি ওঝা, দুজনে মিলে এই খুনের প্লান করেছিলেন, তাই তো”? জিজ্ঞেস করলাম। “না না, রবি এর কিছুই জানতোনা, ও প্রতিবছরই এই সময় ছুটি কাটাতে এখানে আসে, এবারও সেইরকমই বেরাতে এসেছে, আমিও ভেবেছিলাম, রবি এখানে আছে, এই সময় কিছু ঘটলে পুলিশ ওকেই সন্দেহ করবে, কিন্তু এত বছর পর সুব্রত সরকারকে চোখের সামনে দেখে, নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না, আর কোনদিন এইরকম সুযোগ পাবনা ভেবে, সেদিন চলে সন্ধ্যেবেলা আগাগোড়া ঢেকে রবির পরিচয়ে সুব্রত-র ঘরে গিয়ে ঘুমের ওষুধটা পাল্টে দি”। খেয়াল করলাম, কথা গুলো বলতে বলতে আপনিল এর মুখটা রক্তের মত লাল হয়ে উঠেছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তা আপনি যদি রবিবাবুকে ফাঁসাতে নাই চাইবেন, তো শুধু শুধু রবির বাবুর নামটা কেন নিতে গেলেন মশাই”? কপাল চাপরে বলতে লাগলেন, “জীবনে এই একটা ভুলই বোধহয় আমি করেছি, সুনীল যখন মারা যায়, রবির বয়স তখন ৮ বছর, ওকেও এখানকার পুরনো কেউ চেনেনা, আর ওও কাউকে চেনেনা, ভেবেছিলাম প্রমানের অভাবে রবিকে কেউ সন্দেহ করলেও, তেমন কিছু বিপদ ওঁর হবেনা”। “কিন্তু আমি ওনাকে সন্দেহ করেছি বুঝতে পেরে, আপনি আর ঝুঁকি নিলেন না, পাছে আমি রবি বাবুর ইতিহাস জেনে ফেলি আর উনি বিপদে পরেন, আপনি নিজেই আমায় মারতে চলে এলেন, তাই তো”? বললাম আমি। আপনিল মাথা নিচু করে রইল।
অভীকদা বলল, “বড় বড় অপরাধীরাও কিছু না কিছু ভুল করেই থাকেন, আর আপনিতো নিতান্তই সাধারন মানুষ, নিন চলুন আজ থেকে আপনার বাসস্থান পরিবর্তন হল”।
আমি আর মিষ্টি মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। মিষ্টি বলল, সুব্রত সরকার নিজের কর্মফলের শাস্তি পেয়েছেন, আপনিল বাবু তো পুলিশকে জানাতে পারত, তাহলে তো আর বাকি জীবনটা জেলে কাটাতে হতনা। বুঝলাম আপনিলের উপরে মিষ্টির একটু একটু মায়া হচ্ছে, একটু হেসে মিষ্টির চিবুক ধরে বললাম, “সব ভবিতব্য মিষ্টি”, যার সাথে যা হওয়ার, তা হবেই, তুমি এত ভেবোনা”।
আপনিলকে গাড়িতে তুলতে তুলতে অভিকদা বলল, “এবার বলতো বাবাই, তুই কি করে বুঝলি যে তোর উপর আজ হামলা হবে, আপনিল তামাংই যে খুনি সেটা কি তুই আগে থেকেই জানতিস”? খেয়াল করলাম মিষ্টি আমার দিকে রাগী অথচ কৌতূহলী দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। আমি কিছু বলতে যাব এমন সময় মিষ্টি বলে উঠল, “চলুন না অভিকদা আমাদের হোমস্টেতে, ডিনার করতে করতে সবটা শুনবো, আপনিও আজ আমাদের সাথে ডিনার করবেন, কাল তো আমরা চলেই যাব”, শেষের কথাটা বেশ আদো আদো শোনালো।
পুলিশ গাড়ি ছেড়ে দিয়ে অভিকদা আমাদের সাথে আমাদের গাড়িতে উঠে বসল।
খাবার টেবিলে আমাদের সাথে অভিকদা, বিশ্বজিৎ বাবু, রবি বাবু, সাথে রসম গোল করে বসল, আরমান গরম ফ্রাইড রাইস আর চিকেন কষা প্লেটে দিতে দিতে বলল, “হামনে ভি কফি হেল্প কিয়া বাবাই ভাইয়াকো”। সবাই একটু হেসে আমার দিকে চেয়ে রইল। অভিকদা বলল, “নে শুরু কর”।
আমি গলাটা একটু ঝাঁকিয়ে নিয়ে বলতে শুরু করলাম, “আমি বিষয়টা নিয়ে মাথা ঘামাতাম না, যদি না বিশ্বজিৎ বাবুর ছবিটা আমার চোখে পড়তো, সেখান থেকে সন্দেহ শুরু, তারপর আরমান এর মুখে রবি ওঝার কথা জানলাম, ওটাই সাপে বর হল, মিষ্টি আর আমি রবি ওঝার সাথে দেখা করে জানলাম, বিশ্বজিৎ বাবুর সাথে সুব্রত বাবুর পুরোনো শত্রুতা আছে, এটা সুব্রত বাবুই নাকি তাকে বলেছেন চায়ের দোকানে বসে”। “বিশ্বজিৎ বাবু কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু অভিকদা ওঁকে থামিয়ে দিলেন”, আমি আবার বলতে শুরু করলাম, “চা বাগানের ম্যানেজার আর কর্মচারীদের মধ্যে শত্রুতা হওয়াটা খুব অস্বাভাবিক নয়, তাই সন্দেহটা পুরোপুরি বিশ্বজিৎ বাবুর দিকেই চলে গেল, বিশ্বজিৎ বাবুর সাথে কথা বলে তার রাগের কারণটা জানতে পারলাম, কিন্তু তাতে শত্রুতার আভাস পেলাম না, তাহলে কে? হঠাৎ মিষ্টির বলা একটা কথা মনেপড়ে গেল, রবি ওঝার সাথে কথা বলে ফেরার সময় মিষ্টি বলেছিল, যে মানুষটা ৩ ঘণ্টা আমাদের সাথে থেকে ৪ ৫ টা কথা বলেছেন, সে কয়েক মিনিটের আলাপে এত গোপন কথা রবি বাবু কে বললেন? আমারও তাই মনে হয়েছিল, রবি বাবু মিথ্যে বলছিলেন, কিন্তু কেন? তক্ষুণি চলে গেলাম সেই চায়ের দোকানে, দোকানদার সঠিক ভাবে কিছু বলতে পারলেন না। সন্দেহটা বিশ্বজিৎ বাবু থেকে সরে, রবি বাবুর দিকে যেতে শুরু করল, অঙ্কটা একটু মেলানোর চেষ্টা করলাম, সুব্রত বাবুর কারণে একজন ফটোগ্রাফারের পরিবার ধ্বংস হয়েছিল, রবি ওঝার বাবাও একজন ফটোগ্রাফার ছিলেন, তার উপর প্রথমত রবি বাবু আমায় মিথ্যে বললেন যে তারা চায়ের দোকানে দেখা করেছিলেন, দ্বিতীয়ত, আমি কিছু জিজ্ঞেস না করা সত্ত্বেও, তিনি বিশ্বজিৎ বাবু আর সুব্রত বাবুর শত্রুতা ফলাও করে বলতে লাগলেন, আমি একপ্রকার নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে খুনি রবি বাবু ছাড়া আর কেউ হতেই পারেনা। হমেস্টের সামনে আপনিল বাবুর সাথে দেখা। সকালে খেয়াল করিনি যে আপনিল বাবুর ডান হাতের তর্জনীতে নখের কাছে বেন্ডেট দিয়ে জরানো, জিজ্ঞেস করতে বলল নখ কাটতে গিয়ে ব্লেডে কেটে গেছে”। একটু হেসে বললাম, “আপনিল বাবু হয়ত ভুলে গেছিলেন যে, সকালে যখন আমি আর মিষ্টি ওনার দোকানে গেছিলাম, তখনও উনি নখই কাটছিলেন। আমার ধারনা হল, কোন কাঁচের ঢাকনা খুলতে গিয়ে যদি কেটে যায় তাহলে ঐরকম জায়গাতেই কাটবে। অভিকদাকে উদ্দেশ্য করে বললাম, তোমাকে যে শিশিটা পাঠিয়েছি, ওটার মধ্যে নখের সামান্য টুকরো পাবে, ডীএনএ টেস্ট করে দেখো, আসাকরি আপনিল বাবুর সাথে মিলে যাবে”।
“তোর উপর হামলা হবে সেটা কি করে বুঝলি”, কৌতূহলী স্বরে বলল অভিকদা। “বলছি”, বলে আবার শুরু করলাম, “আমি যখন চায়ের দোকান থেকে ফিরছি, তখন খেয়াল করলাম কেউ একজন আমায় দূর থেকে ফলো করছে, যদি আমি খুনির খুব কাছাকাছি পৌঁছাই তাহলে হামলা হওয়াটা কিছু অস্বাভাবিক নয়, আগের দিন মল রোডের ওই পুরোনো বইয়ের দোকানটা লক্ষ্য করেছিলাম, সব পুরোনো বই আর নিউজ পেপারে ঠাসা, ওখানে পুরনো ইনফর্মেশন অবশ্যই থাকবে। আমার প্লান মত ঐ পুরোনো বইয়ের দোকানে আমায় দেখে বিপদ বুঝে আমার উপর হামলা করে বসল, আর এখানেই তিনি সব থেকে বড় ভুলটা করলেন। ব্যাস, তারপর সবটা তোমাদের সামনেই ঘটেছে”।
“কিন্তু একটা কথা আমার মাথায় আসছেনা, বিশ্বজিৎ বাবুর সাথে রবি বাবুর তো কোনো শত্রুতা নেই, তাহলে বিশ্বজিৎ বাবু সম্পর্কে তোমার কাছে মিথ্যে কেন বলল”? জিজ্ঞেস করল মিষ্টি। আমি বললাম, “সেটা রবি বাবুর মুখেই শোনা যাক, কি রবি বাবু”? রবি বাবু বিনীত স্বরে বললেন, “দেখুন আমই প্রথম বুঝতে পারি যে আপনিল আঙ্কেলই এই কাজটা করেছেন, খুব রাগ হয়েছিলো অনেক বাজে কথাও সেদিন বলেছিলাম ওনাকে। আমি শুধু আপনিল আঙ্কেল কে বাঁচেতে চেয়েছিলাম, মানুষটা আমাদের জন্য কি না করেছেন। অবশ্য আমি এটাও জানতাম, যে পুলিশ ঠিক সত্যিটা বের করেই ফেলবে”। “অন্যকে বিপদে ফেলাও একধরনের ক্রাইম জানেনতো”? রাগি স্বরে বলল অভিকদা। হাত জোর করে ক্ষমা চেয়ে মাথা নিচু করলেন রবি বাবু।
“আচ্ছা তাহলে খুনটা হল কি দিয়ে”? জিজ্ঞেস করলেন বিশ্বজিৎ বাবু, একটু ভেবে বললাম, “সুব্রত বাবু ঘুমের ওষুধ খেতেন, আমার ধারণা, আপনিল বাবু যখন সুব্রত বাবুর ঘরে গেছিলেন, সুযোগ বুঝে ঘুমের ওষুধে ডিজিটালিস বা ঐ জাতীয় কোন বিষ মিশিয়েছিলেন, যা একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় মেশালে, দুর্বল মানুষের হার্ট ব্লক হয়ে যায়, সুব্রত বাবু অসুস্থ ছিলেন, তাই ওনার ক্ষেত্রে এটা সুক্ষ কিন্তু মারাত্মক”। অভিকদার দিকে ফিরে বললাম, “খুনি তোমার হাতেই আছে, জেরা করে দেখো, এমনই কিছু হয়েছিল”।
অভিকদা আমার পিঠে চাপর মেরে হাসি মুখে বলল, “সাব্বাস সাথে অনেক অনেক ধন্যবাদ ভাই, তুই না থাকলে এই কেসটা সমাধানই হতনা, ভবিষ্যতে কোথাও আটকে গেলে, তোর মাথাটা আমার লাগবে, সাহায্য করবি আশা করি”। আমি একটু লজ্জা পেয়ে সম্মতি জানালাম।
পরদিন সকালে সবাইকে বিদায় জানিয়ে বেরতে যাব, এমন সময় অভিকদা এসে হাজির। জানলা দিয়ে গলা বাড়িয়ে বলল, আমি শিলিগুড়ি যাচ্ছি, তোরা তো বাড়ি ফিরবি আজ, চলে আয় আমার গাড়িতে, আড্ডা দিতে দিতে যাওয়া যাবে। রহস্য আর উত্তেজনায় ঘেরা হানিমুন কাটিয়ে আমি আর মিস্টি ফিরে চললাম আমাদের দৈনন্দিন জিবনে।