অরন্যা
লেখিকা : মৌমিতা দাস
রোদ ঝলমলে একটা সকাল। উজ্জ্বল নীল আকাশে দলছুট কিছু মেঘের ঢেউ লেগেছে। চারদিকের ঘনসবুজ পাইনবনের মধ্যে নাম না জানা পাখিদের দিনশুরুর আলাপ, কিচিরমিচির। পাথুরে জমির বুকের ভাঁজে ভাঁজে বয়ে যাচ্ছে ঋষি নদীর সুতোর মতো স্রোত, তারই ক্ষীণ কলকল শব্দ। দূরে পাহাড়ের দুধসাদা শৃঙ্গ দেখা যাচ্ছে। বাতাসে যেন সঞ্জীবনীর মূলমন্ত্র, বুকভরে নিঃশ্বাস নিলে যেন নশ্বর দেহের সব রোগ সেরে গিয়ে অমরত্বের চিরযৌবন প্রদান করে। সেখানেই একটা মাঝারি মাপের পাথরের ওপর বসল অরণ্যা। ওর পায়ের কাছ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ঋষি নদীর চোরা স্রোত। বহুদিনকার স্বপ্ন সত্যি হয়েছে ওর, তাই এখনো ঘোরলাগা চেয়ে আছে এই অপার্থিব স্বর্গীয় সুন্দরের দিকে।

কিছুদিন আগেই অরণ্যা একটা কলেজে পড়ানোর চাকরি পায় শিলিগুড়িতে; মেইলটা পড়ে ওর দারুণ একটা অনুভূতি হয় ‘শিলিগুড়ি’ নামটা দেখে। কিছু আশা না করেই ও অ্যাপ্লাই করেছিলো এই কলেজটায়, ওরা ইন্টারভিউ-তে ডাকবে ভাবেনি প্রকৃতিপ্রেমী এই মেয়েটা। এক সপ্তাহ আগেই কাজে জয়েন করেছে অরণ্যা। অসম্ভব ভালোলাগার জায়গা এই পাহাড়, কবে থেকে ও স্বপ্ন বুনেছে একদিন এই সুপ্রাচীনের সুরের মধ্যে হারিয়ে যাবে, খুঁজে পাবে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যাওয়া সেই বৌদ্ধপণ্ডিতের জাতিস্মর প্রেমিকাকে; অথবা দেখা পাবে কোনো বলিষ্ঠ প্রেমিক অরণ্যদেবতার, যার মুখ সূর্যের আলো দিয়ে বোনা- যার গলার স্বর চাঁদের আলোর মতো শান্ত সুন্দর অথচ পাহাড়ের উচ্চতার মতো গম্ভীর। উইকেন্ডে তাই ও চলে এসেছে শিলিগুড়ি থেকে প্রায় পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই স্বর্গীয় সুন্দর গ্রামে। যেখানে পাথুরে জমিতে ও নদীতে বহুযুগের প্রেম প্রবহমান।
চারদিকের আবেগঘন বাতাবরণের মধুর তৃপ্তিতে অরণ্যা গা এলিয়ে দিলো পাথরটার ওপর, নদীস্রোতের কলকল্ ধ্বনি পাখিদের কিচিরমিচির আর বিশাল বিস্তৃত ওই নীল আকাশের গমগমে রাগিনী— ওর শরীর মনের ওপর প্রশান্তি এনে দিলো, চোখ মুঁদে এল ওর। কে জানে কতক্ষণ ওভাবে ঘোরের মধ্যে ছিলো! কাছেই পাইনবনের ভেতর মৃদু একটা গুঞ্জন আর অনেকের পদশব্দে ওর ঘোর কেটে গেল। তড়াক করে উঠে বসল, সূর্য মাথার ওপর উঠেছে ততক্ষণে। আওয়াজটা কীসের দেখতে গিয়ে ও পাইনবনের কাছে চলে গেল— জনাদশেক বৌদ্ধভিক্ষু চলেছে কী এক মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে, তারই গুঞ্জন রব উঠেছে এই দেবভূমিতে। সকলের গেরুয়া বসন ও উত্তরীয়, মুণ্ডিত মস্তক; কারো কারো হাতে আবার জপমালা। ভিক্ষুদের ঐ মন্ত্রোচ্চারণ আর সুশৃঙ্খলিত পথচলার আবেশে অরণ্যা অভিভূত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। যেন ও পৌঁছে গেছে একাদশ কি দ্বাদশ শতাব্দীতে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অরণ্যা, হঠাৎ শেষের ভিক্ষুটির দৃষ্টি ওর দিকে পড়ল। কয়েক মুহূর্তের জন্য অরণ্যার মনে হলো যেন ঝরনার জলে ওর মাথা থেকে পা পর্যন্ত ধুয়ে গেল। কিছুসময় পরেই ভিক্ষুদের মিছিল মিলিয়ে গেল বনের ভেতরে। অরণ্যা যেন স্থবির, কেউ যেন তাকে অবশ করে রেখেছে। একটা পাখির কর্কশ ডাকে ও সম্বিৎ ফিরে পেল।

ছুটি কাটাতে এসে ও এই গ্রামের একটা বাড়িতেই থাকার বন্দোবস্ত করেছে, যাকে বলে হোম-স্টে, সেখানে। হোম-স্টে’র মালিক লাসাং আর তার স্ত্রী গিনা; ভীষণ সরল ভালো মানুষ তারা। একদিনেই অরণ্যাকে আপন করে নিয়েছে এই মধ্যবয়স্ক পাহাড়ি-দম্পতি। ঘরে ফিরতেই গিনা হাসিমুখে ওকে বলল— “দিদি খানা তৈয়ার হ্যায়, আপ ফ্রেশ হো লিজিয়ে, হাম খানা লাগাতে হ্যায়।” হাসিমুখে অরণ্যা “আচ্ছা জি” বলে চলে গেল দোতলার ঘরে। এসেই ও স্নানে গেল না, নরম পরিচ্ছন্ন বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। পাশ ফিরে জানলা দিয়ে তাকালো, দূরে পাহাড় দেখা যাচ্ছে, আর উঁচু পাইন গাছের মাথা। আকাশের নীল যেন আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। অরণ্যার মনটা বেশ ফুরফুরে লাগছে, হঠাৎ বিদ্যুৎঝলকের মতো মনে পড়ল সেই বৌদ্ধভিক্ষুর সুতীক্ষ্ণ গম্ভীর দৃষ্টি; যা ধারালো তীরের মতোই বিঁধেছে ওর বুকে। একঝলক দেখলেই যাঁকে মনে রাখা যায় ভালোভাবেই, বলিষ্ঠ সুদর্শন যুবাপুরুষ, বয়স হয়তো তেত্রিশ কিংবা চৌত্রিশ হবে। অরণ্যা দুপুরের খাওয়া সেরে লাসাং-এর কাছে গেল। জিজ্ঞেস করলো এখানে কাছাকাছি কোনো মনেস্ট্রি আছে কি না। লাসাং-এর থেকে জানতে পারলো এখান থেকে প্রায় কুড়ি মিনিটের হাঁটাপথ। কোনোমতে পাঁচ মিনিট রেস্ট নিয়ে ও বেরিয়ে পড়ল। পরের দিন সকালে যেতেই পারত, কারণ দুপুর তো প্রায় পড়েই এসেছে, কিন্তু আর তো সময় নেই। কাল সন্ধ্যায় ফিরতে হবে ওকে। তারপর দিন থেকেই কলেজ তাই ইচ্ছে থাকলেও থাকা যাবে না। হ্যাঁ পরের উইকেন্ডে অবশ্য আবার আসা যাবে, তবে কালের ভরসায় ফেলে রাখতে অভ্যস্ত নয় সাতাশ বছরের এই সুন্দরী তন্বী। তাই এই পড়ন্ত দুপুরেই ও মনেস্ট্রির খোঁজে বেরিয়ে পড়ল। হাঁটতে হাঁটতে একে তাকে জিজ্ঞেস করে শেষে পৌঁছে গেল বৌদ্ধ মন্দিরটার কাছাকাছি। গমগমে ঘন্টাধ্বনি ভেসে আসছে ভেতর থেকে, রাস্তা থেকে হাত দুই উঁচু পাথুরে জমিতে অবস্থান করছে প্রায় দুশো বছর পুরোনো এই বৌদ্ধবিহার। মন্দিরের চত্বর মোটামুটি ভালোই প্রশস্ত, চারদিকে পাথরের ইটের দেওয়াল এক মানুষ সমান উঁচু; তার দুদিকে দুটো প্রবেশপথ। একটার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই চন্দন কর্পূর আর কী এক মিষ্টি সুগন্ধের বাতাস ওকে স্বাগতম জানালো। মনের মধ্যে যেন দুন্দুভি বাজছে হাজার বছরের ওপার থেকে, বহুযুগের চেনা যেন কেউ হাতছানি দিচ্ছে রহস্যের দ্বার খুলবে বলে। ঘোরলাগা চোখে ও ভেতরে চলে গেল। অনেক ভিক্ষুরা সেখানে তাঁদের নিত্যকর্মে রত। প্রায় সব বয়সের লামা সেখানে আছে। অরণ্যার গভীর কালো চোখজোড়া খুঁজছিল সেই দীপ্তময় পুরুষকে। অনেকক্ষণ না দেখতে পেয়ে চলে এল মন্দিরের বাইরে। প্রবেশপথের কাছে বাগানটায় গিয়ে একটু যেন মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, কারণ বেলি সময় তো থাকতেও পারবে না সে এখানে। ঘন্টাখানেক পরেই ঝুপ্ করে সন্ধ্যা নামবে পাহাড়ের এই লুকোনো সাধনপীঠে। কাজেই অরণ্যা বাগানের অরকিড আর কিছু পাহাড়ি ফুল ঘুরে ঘুরে দেখছিলো, সাদা রঙের কিছু কুচি কুচি ফুলের ঝাক ওর চোখে পড়ল— ভারি অদ্ভুত সুগন্ধ আসছে সেগুলো থেকে। ও যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য হারিয়ে গেল, নিচু হয়ে কয়েকটা ফুল তুলতে যাবে এমন সময়, মেঘমন্দ্রিত স্বরে কে ওর পেছন থেকে বলে উঠলো — “তোড়িয়ে মাত্, ইয়েহ্ ফুল ভগবন্ বুদ্ধ্ কে লিয়ে হ্যায়।” অরণ্যা চমকে পেছন ঘুরে দাঁড়াতেই স্তম্ভিত হয়ে গেল— সকালবেলাকার সেই তেজময় মুখমণ্ডল, সেই গভীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। এখন আরো ভালো করে দেখা দিলো আরো কাছ থেকে, যেন পণ্ডিতি আভা মুখের দুধেআলতা রঙে রাঙা গোধূলি আলোর ছাপ ফেলেছে। হাতের আঙুল যেন শ্বেতপদ্মের পাঁপড়ি। অরণ্যা বাকরুদ্ধ হয়ে গেল সুন্দরের এই তেজস্বীরূপ দেখে। কী বলবে বুঝতে না পেরে ও বলল— “না না মানে ইয়ে, ম্যায় তো বাস্ দেখ্ রহি থি।” এই শীতেও অরণ্যা বুঝল ওর গালদুটো বেশ গরম হয়ে উঠেছে। কিছুক্ষণ সেই দীপ্তিমানকে দেখে সে চলে যাবার জন্য এগোতেই আবার সেই মেঘমন্দ্রিত স্বর ভেসে এল— “সান্ধ্যা হোনেকো হ্যায়, ইয়ে জাগাহ্ রাত মে সহি নহি হ্যায়। আপ ঘর জাইয়ে।” আদেশমতো এক পা এক পা করে এগিয়ে গেল অরণ্যা গেটের দিকে। তাড়াতাড়ি ফিরছিলো হোম-স্টে’র দিকে, পাহাড়ি রাস্তা সন্ধ্যার পর সত্যিই গা ছমছমে। কিছুদূর গিয়েই লাসাং কে দেখতে পেল সে, তাকেই এগিয়ে নিতে এসেছে লাসাং। নিশ্চিন্তে ঘরে ফিরল অরণ্যা।

রাতে কিছুতেই ঘুম এলো না। কেবল ওই তেজময় ভিক্ষুর মুখ প্রস্ফুটিত শ্বেতকমলের মতো জেগে রইল ওর চারপাশে। বেশ রোমান্টিক মন অরণ্যার, তাই বলে শেষে একজন লামার প্রেমে পড়ল ও? এও কি সম্ভব! আর সত্যিই তো, প্রেমে পড়ার মতোই দীপ্ত তিনি, দৃঢ় অথচ অসীম। এমন প্রেমিককেই তো সে চেয়েছে। কিন্তু তিনি একজন সন্ন্যাসী, যদি শাপ-শাপান্ত করেন; ওরে বাবা যদি মন্ত্র পড়ে ব্যাঙ্ বা টিকটিকি বানিয়ে দেন, কী হবে! ধুর্ কীসব ছাইপাঁশ ভাবছে সে! এসব কথা ওর মনের মধ্যে চলতে লাগলো রাত বাড়ার সাথে সাথে। প্রেমে কখনো পড়েনি ও আগে; ছোটোবেলায় তুলতুলি দিদিকে দেখেছে প্রেমে কেঁদে ভাসাতো সে। সেই থেকে অরণ্যার ধারণা হয়েছিল- প্রেম করলেই এসব কান্নাকাটি যন্ত্রণা, কী দরকার বাবা এসব বোগাস প্রেম টেম করার! বাবার বন্ধু অধীর কাকু খুব আসতেন আগে সপরিবারে ওদের বাড়িতে। অধীর কাকুর ছেলে বর্ষণ, ওর থেকে প্রায় তিন-চার বছরের বড়। খেলতে খেলতে শুধু ওকে বলতো— “বড় হলে তোকেই বিয়ে করবো বুঝলি অরণ্যদেবী।” ছোট্ট অরণ্যা নাক কুঁচকে বলতো— “ইইস্, তুই ওই রিকুকে বিয়ে কর গে যা।” বলে হেসে লুটিয়ে পড়তো। রিকু ওদের পোষা বেড়াল ছিল। এসব মনে পড়তেই ও একা হেসে ফেলল।
যাইহোক, লামার প্রেমে পড়বে এটা কখনো ভাবেনি অরণ্যা, কিন্তু মনটা এরকম অস্থির হয়ে থাকলে ও পড়াশোনা করবে কীভাবে! আর পড়াবেও বা কীভাবে! এটা কি ঠিক হলো! প্রেম একটা মানুষ বা রিকুর মতো বেড়াল হলে আচ্ছা করে পিটিয়ে দিত ও। কিন্তু কী আর করার! এরকম হতচ্ছাড়াই হয় বোধহয় প্রেম, যেখানে সমস্যার পর্বত সেখানেই সে নেচে নেচে যাবে। এসব এলোপাথাড়ি ভাবতে ভাবতে ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়ল অরণ্যা, ও স্বপ্ন দেখল— পাহাড়ের উঁচু টিলায় মনেস্ট্রি নেই, সেই জায়গায় এক যোগীপুরুষ ধ্যানমুদ্রায় বসে আছেন- তাঁর অর্ধোন্মীলিত চোখ, শরীর থেকে যে তেজস্বী আভা নির্গত হচ্ছে তার আলোয় পাহাড়ি বন আলোকিত। কী কোমল সেই দিব্য আভা, তারই মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসছে এক যুবতী তন্বী, হাতে তার শ্বেতপদ্মের মালা। সেই নারী ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে সেই ধ্যানরত যোগীর দিকে, যেন বরমাল্য পরাবে তাঁর গলায়, তাই সেই নারী সলজ্জ, অধরে তার মৃদু হাসি। দূরে গমগমে ঘন্টাধ্বনি শোনা যায়।
একটু বেলা করেই ঘুম ভাঙে অরণ্যার। ভোরের স্বপ্নের কথা ভেবে ওর শিহরণ জাগে, কোথায় যেন হারিয়ে যায় ও। তাও তাড়াতাড়ি ওঠে, অনেক কাজ, আজকেই ফেরা, গোছানো হয়নি কিছুই। আজ সে লাসাং আর গিনাকে যেন নতুন করে আবিষ্কার করলো, কী গভীর প্রেম ওদের মধ্যে- জনপদের কোলাহলে আড়ালে পাহাড়ের কোলে দুটি প্রেমিক প্রেমিকা নিজেদের প্রেম দিয়ে মুড়ে রেখেছে যেন। অরণ্যার মনটা খুশিতে ভরে গেল ওদের দেখে। আজ সন্ধ্যায় তাকে ফিরতে হবে, কাল থেকে কলেজ। চট্ করে রেডি হয়ে সক্কাল সক্কাল ও মনেস্ট্রির দিকে এগিয়ে গেল। মন্দিরে ঢোকার মুখে দাঁড়িয়ে ও দেখতে পেল সেই তেজময় লামা ফুল তুলছেন এক হাতে বেতের সাজি নিয়ে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো সেদিকে। হঠাৎ সেই সন্ন্যাসীর চোখে চোখ পড়তেই ও হাসলো একটু, সন্ন্যাসীও হেসে আবার ফুল তোলায় ব্যস্ত হয়ে গেলেন। অজানা এক আনন্দ নিয়ে ফিরে এল অরণ্যা।

কলেজে যায়, পড়ায়, কিন্তু কোনো কিছুতেই যেন মন নেই। পরের উইকেন্ডে বাড়ি যেতে হবে। নিজের পড়ালেখাও হচ্ছে না। সেই তেজময় ভিক্ষু সবসময় তার মন মস্তিষ্কে বিরাজ করছেন। সন্ন্যাসীকে প্রেম নিবেদন করাটা কি ঠিক হবে! এর পক্ষে বিপক্ষে যুক্তি তর্ক বিবাদ করে সে নিজেই নিজের রাগের কারণ হয়ে উঠছিলো। এদিকে সপ্তাহ শেষের পথে। বাড়ি ফিরতে হবে। কিন্তু যাবার আগে একবার তাঁকে বলতেই হবে যেবাবেই হোক। তারপর যা হবে ও সবটা বুঝে নেবে। তাই অরণ্যা একদিনের ছুটি নিয়ে ফের গেল লাসাং-গিনার কাছে। দুপুর হলো পৌঁছোতে। ওকে পেয়ে লাসাং আর গিনা খুব খুশি হয়েছে। অরণ্যা কোনোমতে দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে রওনা হলো বৌদ্ধবিহারের দিকে। পথে যেতে চোখে পড়ল গুচ্ছ গুচ্ছ সাদা ফুল, মিষ্টি গন্ধে রাস্তাটা ভরে আছে। অরণ্যা বুকভরে নিঃশ্বাস নিলো, সাথে সেই একগুচ্ছ সাদা সুগন্ধি ফুল তুলে নিলো। গোলাপ নেই, এই সাদা ফুলেরাই তার প্রেমের অর্ঘ্য হোক। মনেস্ট্রিতে পৌঁছে অরণ্যা চারদিকে লাগলো সেই শ্রীজ্ঞান কে। পেল না দেখা। সংকল্প ভেঙে যাবে ভেবে প্রায় কেঁদে ফেলেছিলো সে, কোনোমতে সামলে নিয়ে অন্য এক লামাকে তাঁর কথা জিজ্ঞেস করে জানতে পারলো তিনি গিয়েছেন এখান থেকে দশ কিলোমিটার দূরের একটা বিহারে, কিছু কাজ সমাধা করতে। অরণ্যা যেন মুষড়ে পড়ল, ফুলগুলো হাতে নিয়ে একবার মনেস্ট্রির ভেতরে গেল, গমগমে ঘন্টাধ্বনি আর চন্দন কর্পূরের সুগন্ধে বাতাসে পবিত্র শক্তি ভেসে বেড়াচ্ছে। ফেরার পথে অরণ্যা দেখা পেল তার দীপ্তময়ের, ক্লান্তপ্রায় হয়ে ফিরছেন পদব্রজে। হঠাৎ, আনন্দকে মনে পড়ল— হ্যাঁ, রবি ঠাকুরের ‘চণ্ডালিক’র সেই আনন্দ। ক্লান্ত অবসন্ন পিপাসার্ত আনন্দ, যাকে জল দিয়েছিলো চণ্ডালিনী প্রকৃতি, আর এক ঝলকেই প্রেমে পড়েছিলো। কিন্তু সেই প্রেম আনন্দকে দিয়েছিলো অপার যন্ত্রণা।
হঠাৎ অরণ্যার মাথার ভেতর সব কেমন ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল। সে কি প্রকৃতির মতো নিষ্ঠুর হবে এক সন্ন্যাসীকে প্রেম নিবেদন করে? পাপের ভাগী হবে এক স্নিগ্ধ পবিত্র সংসার ত্যাগী ভিক্ষুর কাছে প্রেম চাইবার ধৃষ্টতা করে? না না; এ কাজ কি অরণ্যা বসুমল্লিক কে মানায়! যে একজন অধ্যাপিকা! নিজেকে সে এভাবে ভুলে গিয়েছিলো! ছি ছি ছিঃ! তড়িৎগতিতে এগিয়ে গেল অরণ্যা সেই তেজস্বী শ্রীজ্ঞানের কাছে। চোখে উষ্ণস্রোত, ঋষি নদীর মতো বইছে। এই নির্জন প্রান্তে একটি একা মেয়েকে দেখে একটু থমকে দাঁড়ালেন সন্ন্যাসী। ঠোঁটের কোনে অসীম উদারতার এক টুকরো হাসি। অরণ্য কিছু বলতে পারল না, নিচু হয়ে একগুচ্ছ সাদা ফুল রাখলো ভিক্ষুর পায়ের কাছে, যে ফুলগুলো ওর জলে ধৌত হয়েছে ইতিমধ্যে। প্রণম্যকে প্রণাম করে একছুট্টে চলে গেল সেখান থেকে।

একবুক তৃপ্তি নিয়ে বাড়ি ফিরছে অরণ্যা। সুদৃশ্য পাহাড়ি ঝরনা কে ওই নির্জন সুন্দর পাহাড়ের কোল থেকে তুলে এনে যদি ঘিঞ্জি লোকালয়ে বাস ট্রামের ভিড়ের পাশে বসিয়ে দেওয়া হয়, তবে তার সৌন্দর্য তো চোখেই পড়বে না, বরং তা মূর্তিমান একটা বিরক্তির কারণ হবে। যেখানকার যা, তাকে ঠিক সেখানেই মানায়। তাই তো বলেছেন কবি— “বন্যেরা বনে সুন্দর”। অরণ্যা পাহাড় থেকে সমতলে আসার পথে একথাই চিন্তা করছিলো। সত্যিই তো, কী অনুচিত্ কাজটাই না সে করতে যাচ্ছিল! সারারাত সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে সকাল আটটা নাগাদ শিয়ালদহ স্টেশনে পৌঁছলো। সেখান থেকে ট্রেন পালটে আরো দু’ঘন্টার পথ পেরিয়ে তার বাড়ি। অলস গতিতে সে পাল্টি ট্রেনের প্লাটফর্মের দিকে এগোচ্ছিলো। ট্রেন আসার এখনো কুড়ি মিনিট দেরি আছে, তাই সেদিকটায় গিয়ে দাঁড়িয়ে অনেককিছু ভাবছিল ও। হঠাৎ ওর চিন্তার জাল ছিঁড়ে একটা বলিষ্ঠ পুরুষালি কন্ঠ বলে উঠল— “অরণ্যের দেবী কার চিন্তায় মগ্ন জানতে পারি?”
– “তুই? মানে তুমি?…” আরো প্রশ্ন করার আগে সেই সুদর্শন যুবকটি বলল— “আজ্ঞে ম্যাডাম, অধমের নাম বর্ষণ রায়। বিগত দু ঘন্টা ধরে অপেক্ষারত আপনারই জন্যে।”
কোথাও যেন হারিয়ে যাওয়া একটা হাসি অরণ্যার ঠোঁটে এসে ধরা দিলো। সেই দস্যি ছেলেটা, আজ একজন সফল হার্ট স্পেশালিস্ট- হৃদয়ের ডাক্তার। অরণ্যা সেই গভীর আকাশ চোখের দিকে তাকিয়ে ভাবলো, চারদিকটা কত জীবন্ত! তার কিছু বলার আগেই বর্ষণ রায় অরণ্যার একটা হাত ধরে হেসে বলল— “বড় হয়ে গেছি অরণ্যদেবী, তাই অপেক্ষার নাম রেখেছি প্রিয়তমা।”
অরণ্যার চারপাশে ভিড়ের মধ্যে ভায়োলিন বাজছে মনে হলো, কোথায় কোন্ বইয়ের পাতায় তলিয়ে গেল ‘আনন্দ’- দ্য বুদ্ধিস্ট্ লামা।

প্রেম, আত্মঅনুসন্ধান আর জীবনের জটিলতার এক অনন্য কাহিনি! অরণ্যার এই সফরে কি সত্যিই ভালোবাসার পরিপূর্ণতা এসেছে? নাকি জীবন তাকে নতুন এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে? এই গল্প আপনাকে ছুঁয়ে যাবে হৃদয়ের গভীরে। যদি ভালো লেগে থাকে, তাহলে শেয়ার করুন আর কমেন্টে জানিয়ে দিন আপনার অনুভূতি! ❤️✨